
ঢাকার খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী এক, দুই ও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও তেল মিললেও বিক্রি হচ্ছে বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, লিটারে মাত্র এক টাকা লাভ থাকায় তারা এখন বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রিতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
বুধবার সেগুনবাগিচা বাজারের কিচেন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অন্তত ছয়টি মুদি দোকান ঘুরে দেখা যায়, মাত্র দুটি দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল রয়েছে। তবে কোনো দোকানেই আধা লিটার বা এক লিটারের বোতল পাওয়া যায়নি। একটি দোকানে দুই লিটারের বোতল এবং অন্যটিতে শুধু পাঁচ লিটারের বোতল ছিল।
বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া তীর, ফ্রেশ ও পুষ্টি ব্র্যান্ডের কোনো তেলও এসব দোকানে পাওয়া যায়নি। যেসব তেল ছিল, সেগুলো অন্য কোম্পানির।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, এসব কোম্পানি এখন নতুন করে বাজারে অর্ডার নিচ্ছে না। দোকানে থাকা তেলও অন্য পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বিক্রেতাদের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ডিলার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও তারা আগের তুলনায় কম তেল পাচ্ছেন।
সরবরাহ সংকটের এই দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেরও মিল পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো আবারও সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। এবার তারা প্রতি লিটারে আরও ১৩ টাকা দাম বাড়াতে চায়। এ বিষয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
তবে শুধু সরবরাহ কমে যাওয়াই নয়, খুচরা বিক্রেতাদের কমে যাওয়া মুনাফাও বাজারে বোতলজাত তেলের সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে খুচরা বিক্রেতাদের ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত লাভের সুযোগ দিত। এখন সেই লাভ কমে হয়েছে মাত্র এক টাকা।
সেগুনবাগিচার মাহিন জেনারেল স্টোরের রাজিব হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের দাম এখন ১ হাজার ২০ টাকা। এই তেল বিক্রি করে তাঁর লাভ হবে মাত্র পাঁচ টাকা। এত টাকা বিনিয়োগ করে অন্য পণ্য বিক্রি করলে কয়েক গুণ বেশি লাভ করা সম্ভব। এর ওপর কোম্পানিগুলোও ঠিকমতো তেল দেয় না, তেল পেতে অনেক অনুরোধ করতে হয়। এ কারণে তিনি তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
শুধু রাজিব হোসেন নন, একই অভিযোগ করছেন আরও অনেক খুচরা ব্যবসায়ী। শহীদ স্টোরের এক বিক্রেতা বলেন, কোম্পানিগুলো খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে অরাজকতা করছে। এ কারণে তারাও তেল রাখছেন না।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ২০৪ টাকা। সেই তেল বিক্রি করে লাভ হয় মাত্র এক টাকা, অর্থাৎ মুনাফার হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মতো। এত কম লাভে কোনো পণ্য বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
আল্লার দান স্টোরের শিপন মিয়া বলেন, তাদের এখন কোনো কমিশন নেই। এর মধ্যে সরবরাহকারীরা বাকিতে তেল দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন গাড়িতে করে তেল নিয়ে আসার পর পুরো টাকা নগদে পরিশোধ করতে হয়। অনেক সময় সরবরাহকারীরা দোকানে আসার সময়ও হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগের মতো দোকান থেকে অর্ডার নিয়ে পরে পণ্য সরবরাহের পদ্ধতিও এখন বন্ধ। পণ্য নেওয়ার আগেই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। আগে পণ্য নেওয়ার পর টাকা পরিশোধের সুযোগ ছিল।
এসব কারণে বাজারে যে পরিমাণ বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও অনেক বিক্রেতা দোকানে প্রকাশ্যে রাখছেন না। কেউ কেউ তেল আড়ালে রাখছেন এবং শুধু নিয়মিত ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। নতুন ক্রেতারা গেলে তেল নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
খুচরা বাজারের এই চিত্রের সঙ্গে ভিন্নতা দেখা গেছে কাছাকাছি সুপারশপে। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরের একটি সুপারশপে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এক থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল রয়েছে।
সুপারশপটির এক প্রতিনিধি বলেন, সেখানে তেলের কোনো সংকট নেই। সব কোম্পানির তেল নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে এবং বিক্রিও হচ্ছে। অন্য সুপারশপগুলোতেও তেল রয়েছে বলে জানান তিনি।
খুচরা দোকানে সংকটের কারণ জানতে চাইলে ওই প্রতিনিধি বলেন, খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছা করেই তেল রাখছেন না। কারণ বর্তমানে তেল বিক্রি করে মুনাফা প্রায় নেই বললেই চলে।
সুপারশপে যদি তেল পাওয়া যায়, তাহলে খুচরা দোকানে কেন সংকট হচ্ছে, জানতে চাইলে মালিবাগ এলাকার পাইকারি তেল বিক্রেতা আমিনুল হক বলেন, সুপারশপগুলো পরিবেশকের দামে বা ডিপি প্রাইসে তেল কেনে। ফলে তারা খুচরা বিক্রেতার লাভ এবং পরিবেশকের লাভ, দুটোই পায়। পাশাপাশি সুপারশপগুলোকে বাকিতে পণ্য দেওয়া হয় এবং তাদের নিজস্ব পরিবহন ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব সুবিধা পান না।
দেশে সয়াবিন তেল মূলত দুইভাবে বিক্রি হয়। একটি বোতলজাত এবং অন্যটি ড্রামে থাকা খোলা তেল। খুচরা বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট থাকলেও খোলা তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে বোতলজাত তেলের সংকটের কথা বলে খোলা তেলও বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ২১০ থেকে ২২০ টাকা এবং পাম তেল ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তেল কিনতে গেলে ক্রেতাদের বোতলজাত তেলের তীব্র সংকটের কথা জানানো হচ্ছে।
তবে পাইকারি বাজারে তেলের দাম এর তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, কোম্পানিগুলো নিয়মিত তেল সরবরাহ করছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে তেল পাইকারি বাজারে আসছে। সেখানে কোনো সরবরাহ সংকট নেই।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ৭ অক্টোবর ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৮১ টাকা এবং পাম তেল ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী ভুট্টোর দাবি, কোম্পানিগুলো খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমিয়ে দেওয়ায় তারা বোতলজাত তেল বাদ দিয়ে খোলা তেল বিক্রির দিকে ঝুঁকেছেন। এতে খোলা তেলে তুলনামূলক বেশি মুনাফা করছেন তারা।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোও এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বোতলজাত তেলের বাজারে কয়েকটি বিষয় নজরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার মার্জিন কমিয়ে দেওয়া। এতে অনেক খুচরা বিক্রেতা তেল বিক্রি বন্ধ করেছেন। কেউ কেউ আবার বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।
এ পরিস্থিতিতে সারা দেশে বাজার তদারকি করছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো নতুন করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর আগে তাদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে সয়াবিন তেলের দাম ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও বাজারের সংকট কাটেনি। এখন আবারও তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্রের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। এ নিয়ে শিগগিরই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।



